দরিদ্রতার শিকলে সোনাগাজীর উপকূলীয় মানুষ

লেখক:
প্রকাশ: ৬ years ago

Manual3 Ad Code

 

Manual8 Ad Code

সৌরভ পাটোয়ারী, (ফেনী) :
বাপ-দাদার আমল থেকে শুরু করে দরিদ্রতার শিকলে বাঁধা সোনাগাজীর উপকূলীয় অঞ্চলের লক্ষাধিক মানুষের জীবনযাত্রা। বেঁচে থাকার জন্য কঠোর পরিশ্রম করলেও দিনে আনা দিনে খাওয়া পরিবারের সদস্যদের ভাগ্য বদলায় না। এখানকার মানুষ প্রধান পেশা মাছ ধরা(জেলে), কৃষিকাজ, ক্ষুদ্রব্যবসা ও দিনমজুর। নদীভাঙ্গনে অনেকে হারিয়েছে মাথা গোজার ঠাঁইসহ সহায়-সম্বল। ছোট ফেনী নদী ও বড় ফেনী নদীর দুই কূল ঘেঁষে চরাঞ্চলের এসব লোকজনের বসবাস। প্রকৃতির সাথে যুদ্ধ করে কোন রকম বাঁচলেও এনজিও ঋণ ও দাদনব্যবসায়ীর দেনা পরিশোধ করতে করতে চলে যায় জীবন। অভাব অনটনের কারণে জীবনের সঞ্চয় করা কাকে বলে তা জানা হয়নি ওদের। সোনাগাজীর পূর্ব চরছান্দিয়া, চর আবদুল্লাহ, চর সুজাপুর, চর সোনাপুর, সাহাপুর, পশ্চিম চর দরবেশ ও দক্ষিণ-পশ্চিম চরদরবেশ গ্রামে চিত্র এমনই।

ভাগ্যবঞ্চিত কয়েকটি গ্রামের মধ্য অন্যতম জেলেপাড়া। সোনাগাজীর নদীর পাড়ে দক্ষিণ পূর্ব চরছান্দিয়া ও চরখন্দকার গ্রামের মাঝামাঝি স্থানে এটি অবস্থিত । এক সময় বহদ্দার হাট নামে এখানে ঐতিহ্যবাহী বাজার ছিলো। কালের বির্বতনে ও নদী ভাঙ্গনে বর্তমানে বাজারটি অস্থিত্বহীন। তবে জীবনের সাথে যুদ্ধ করে প্রায় দুই শতাধিক জলদাস পরিবারের বসতি রয়েছে অস্থিত্বহীন বাজারটিকে ঘিরে । আধুনিক ও ডিজিটাল যুগেও এখানকার জলদাস পরিবারের লোকজন মৌলিক অধিকারগুলো থেকে বঞ্চিত। নেই শিশুদের জন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। ফলে শিশুরা প্রাথমিক শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত। প্রায় আড়াই কিলোমিটার দূরে অবস্থিত দক্ষিণ-পূর্ব চরছান্দিয়া সরকারী প্রাথামিক বিদ্যালয়ে পড়ালেখা করে গুটিকয়েকজন শিশু । যে বয়সে কোমলমতি শিশুর হাতে বই থাকার কথা, সে বয়সে তাদের হাতে থাকে জাল। নেই স্বাস্থ্যসম্মত স্যানিটেশন ব্যবস্থা। যার ফলে যত্রতত্র মল ত্যাগ করতে হয় শিশু বৃদ্ধ সকলকে। ৫০টি পরিবারের নিজস্ব কোনো মাথা গোঁজার ঠাঁই কিংবা জায়গা নেই। ভূমিহীন এসব জলদাস পরিবারের সদস্যরা থাকেন পানি উন্নয়ন বোর্ডের পরিত্যক্ত জায়গায়। যে কোন মুহুর্ত্বে উচ্ছেদ সম্ভাবনার ঝুঁকিতে বসবাস করেন তারা। আর যাদের থাকার ঘর আছে সেটিও নড়বড়ে। নদীতে মাছ শিকার করে তাদের টাকা আয় হয় মহাজনের দাদন শোধ করে শূন্য হাতে ঘরে ফিরতে হয়। বিষন্ন মনে ঘরে ফিরলেও বউ-সন্তানের নিত্য চাহিদা মেঠাতেও ব্যর্থ এখানকার জেলেরা। সোনাগাজীর উপকূল ঘুরে এমন চিত্র পাওয়া যায়।

Manual2 Ad Code

ফেনীর সোনাগাজীর উপকূলীয় অঞ্চলের অধিকাংশ জনগোষ্ঠীর প্রধান পেশা নদীতে মাছ শিকার বা জেলে। জেলেদের শিকারকৃত মাছ ফেনীর সোনাগাজীসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষের খাদ্য-পুষ্টি জোগানোর ক্ষেত্রে অবদান রাখছে। সোনাগাজীর উপকূলের ভেজাল মুক্ত মাছ ফেনী জেলা শহরের সবার পছন্দের তালিকায় । সেই মাছ শিকার করতে প্রকৃতির সাথে যুদ্ধ করে টিকে থাকতে হয় জেলেদের।

বর্ষার প্রারম্ভে নদীতে প্লাবন এলে জেলেদের দু:খ বাড়ে। ১০ নং মহাবিপদ সংকেতেও উপকূল ঘেঁষে জন্ম নেওয়া মানুষগুলোর পুরো জীবনটাই কাটে সংগ্রামে।
যে জেলেরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে, ঝড়-তুফান ও বৈরী আবহাওয়া উপেক্ষা করে নদীতে মাছ ধরে দেশের বিপুলসংখ্যক মানুষের আমিষ জোগান, সেই জেলেদের জীবন কষ্টে কাটে। আবার নদীর উজানে জালে মাছ উঠলে জেলেদের মনে হাসি ফোটে।
জেলেপাড়ার হর মোহন জলদাস(৭০) বলেন, অন্যে জায়গায় থাকি, জীবনের বাকি কটা দিন হয়তো এই কাজ করেই পার করতে হবে। জীবনের শেষে মরণও হবে অন্যের জায়গায়, এটাই বড় দু:খ।

উপকূলের নদীভাঙ্গা মানুষের জীবনের হিসেবটা এমনই। জীবনভর মাছ ধরা, কৃষিকাজ ও দিনমজুরী পেশায় জড়িত বেশকিছু মানুষের সঙ্গে আলাপে এ তথ্য উঠে আসে।

Manual6 Ad Code

একই পাড়ার সুখি জলদাস(৫০) বলেন জীবনে ফেলে আসা সেই দিনগুলোর দিকে তাকিয়ে দেখেন অবশিষ্ট কিছুই নেই। না হয়েছে এক টুকরো স¤পদ, না পেরেছেন ছেলে-মেয়েদের লেখাপড়া করাতে, জীবনকে সপে দেন নিয়তির হাতে।

Manual8 Ad Code

নারী জলদাস ফুলপ্রিয়া জানান, সব সময় সাংবাদিকরা এসে ছবি তুলে নিয়ে যায়। আমাদের দাবীগুলো অবহেলিত রয়ে যায়। সাংবাদিককে উদ্দেশ্য করে তিনি বলেন, সরকারকে বলবেন এক টুকরো জমি দিতে, যেন সেখানেই মরতে পারি।

জেলেদের সর্দ্দার প্রিয় লাল জলদাস বলেন, আমাদের এখানের বেশির ভাগ পরিবার ভূমিহীন। পূঁজা দেয়ার মতো একটি ভালো মন্দির নেই। নেই শশ্নান ঘাট নাই স্কুল।

চরছান্দিয়া ইউপি চেয়ারম্যান মোশারফ হোসেন মিলন জানান, জেলে পাড়ায় প্রর্যাপ্ত স্বাস্থ্যসম্মত স্যানিটেশন ব্যবস্থা নেই স্বীকার করে বলেন, একটি তাদের নামে একটি স্বাস্থ্যসম্মত স্যানিটেশন ল্যাট্রিন ও একপি গভীর টিউবওয়েল দেয়া হয়েছে। সরকার যে সময় যে বরাদ্ধ দেয় আমরা তা দিচ্ছি এবং দারিদ্র্য দেখে ১০টাকা দামে চাউল দেয়া হচ্ছে।

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন।
Manual1 Ad Code
Manual8 Ad Code