

খুব-ই দুরন্ত একটি ছেলে, নাম তার মাহিম। সবে মাত্র ক্লাস ফাইভ এ পড়ে। করোনায় স্কুল বন্ধ থাকায়, লেখাপড়ায় তার কোনো মন-ই নেই। সারাদিন শুধু খেলা-ধুলা আর মাঝে মাঝে গল্প শোনে। তাই,নিয়মিতই বাবা-মায়ের কাছ থেকে বকা-ঝকা শুনতে হয়। আজও ঠিক তেমনি-ই হলো, বাবা অফিস থেকে এসে দেখলেন মাহিম খেলায় ব্যস্ত। দেখেই বাবা বলল,”মাহিম পড়তে বসো”! আরও দিলেন নানান ধমক। কিন্তু সে কিছুতেই পড়তে চায় না। বাবার ধমক শোনার পরও সে পড়তে গেলো না, গেলো দাদার ঘরে গল্প শুনতে।
দাদা তাকে দেখেই বলল, তা কি হলো,মাহিম! আজও বুঝি বাবা ধমক দিয়েছে?
মাহিম কেঁদে বলল, হুম, আমায় সারাদিন শুধু পড়তে বলে স্কুল বন্ধ,তাই পড়তে একদম ভালো লাগে না।
দাদা বলল, তাহলে, তুমি বড়ো হবে কী করে?
মাহিম বলল, তা, এতো উপদেশ শুনতে চাই না। আজ একটা ভালো গল্প শুনাবে? এ জন্য-ই এসেছি, তোমার কাছে।
দাদা বলল, তাহলে এখন আর দুষ্টুমি করবে না, মনোযোগ দিয়ে শোন!
এক ছিলো, এক রাজা। রাজার ছিলো দুই ছেলে। সকলে ছোট বাবু,আর বড়ো বাবু বলে ডাকতো। রাজা বড়ো বাবুকে খুব ভালোবাসেন,আদর করেন। কেননা,সে ছিলো খুব ভালো ছাত্র,রাজ্যে ছিলো অনেক সুনাম। পন্ডিত মশায়ও নিয়মিত-ই তার মেধা নিয়ে প্রশংসা করতেন। অন্যদিকে ছোট বাবুকে নিয়ে রাজা সবসময় থাকেন চিন্তিত। কারণ, সে বড়ো দুষ্টু,আজ মহারাজার কোষাগার থেকে চুরি, কাল মহা রাজার কাছ থেকে চুরি, পরশু অন্য কারও কাছ থেকে! আরও কতো রকম দুষ্টুমী। এই দুষ্টুমী আরও বাড়তে লাগলো,বড়ো বাবু যখন উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশ চলে যান। ছোট বাবু হয়ে যান একা, মিশতে থাকেন রাজ্যের খারাপ ছেলেদের সাথে। এভাবেই সে করে ফেললো এক বড়ো অপরাধ।
মাহিম বলল, তারপর কী হলো দাদা?
দাদা বলল, অস্থির হয়ও না, শোন!
শাস্তি স্বরূপ রাজা দিলেন ৫ বছরের জেল। এ শুনে রাণী অনেক কষ্ট পেলেন,ছুটে গেলেন রাজার কাছে।
গিয়ে বললেন,
আপনি রাজা, তাই বলে বাবা হয়ে ছেলেকে এতো বড়ো শাস্তি দিতে পারেন না।
রাজা বললেন, আমি সবার-ই রাজা। আমি অন্য জনকে যে শাস্তি দিতাম, ছেলেকেও তাই শাস্তি দিয়েছি। না হয় আমি অপরাধী হব।
শুনে রাণী কেঁদে কেঁদে চলে গেলেন তার ঘরে। রাজাও মনে মনে কষ্ট পেলেন।
তারপর, জেলে নিয়ে যাওয়া হলো ছোট বাবুকে। জেলের ভিতর একঘেয়ে জীবন তার একদম-ই ভালো লাগেনা। এভাবে এক-দু’ মাস যাওয়ার পর। ছোট বাবু সিদ্ধান্ত নিলেন, তার কিছু একটা করা দরকার। একদিন রাণী গেলেন, তার ছেলেকে দেখতে। আর কেঁদে কেঁদে ছোট বাবুকে বললেন, বাবা, কেমন আছিস? খুব কষ্ট হচ্ছে তাই না!
ছোট বাবু লজ্জায় কোনো উত্তর-ই দিলেন না। কারণ, তিনি তার ভুলগুলো বুঝতে পেরেছেন, অনুতপ্ত হয়েছেন।
একটু পর ছোট বাবু তার মাকে (রাণী) কে বললেন, মা! আমার জেলে একঘেয়েমি জীবন একদম ভালো লাগে না, আমি কিছু একটা করতে চাই, ভালো হতে চাই।
শুনে রাণী খুব-ই খুশি হলেন, আর বললেন, সত্যি-ই বললি বাবা! তুই ভালো হবি?
ছোট বাবু বলল, হ্যাঁ। ভালো হবো।
তখন রাণী তাকে বলল, তাহলে তুই আজ থেকে বই পড়া শুরু কর,জ্ঞানী হবি। তারপর থেকে ছোট বাবু মায়ের পরামর্শে শুরু করলেন বই পড়া। প্রতি সপ্তাহে-ই রাণী দেখতে আসেন, আর দিয়ে যান নানান রকম বই। পড়তে পড়তে ছোট বাবু হয়ে গেলেন মস্ত বড়ো জ্ঞানী। এভাবেই বই পড়ে কেটে গেলো পাঁচটি বছর। অথচ, রাণী ব্যতীত, রাজা ও রাজ্যের কেউ-ই তা জানে না। রাজা ছোট বাবুকে রাগে -অভিমানে একদিনও দেখতে আসেননি, নেননি কোনো খবর।
জেল থেকে বের হওয়ার পর, ছোট বাবুকে চিনতে পারা যায় না। তিনি তার বাবার প্রাসাদে গেলেন না। ভবঘুরের মতো ঘুরতে লাগলেন। এখন আর আগের মতো উচ্ছৃঙ্খল নন, খুব নম্র, ভদ্র ও শান্ত। সারাদিন প্রধান পেশা হলো, শুধু পড়া আর পড়া। রাজ্যের বড়ো বড়ো পন্ডিতেরাও এখন তার মতো এতো জ্ঞানী না। এ খবর দেশ-বিদেশে ছড়িয়ে গেছে। অন্য রাজ্য থেকেও লোক আসে তাকে দেখতে, তার সাথে কথা বলতে। এসব লোক মুখে শোনা ও দেখার পর রাজাও অবাক হয়ে গেলেন। কিন্তু লজ্জায় আর যাওয়ার সাহস পেলেন না, গেলেন না। বড়ো বাবুও বিদেশ থেকে খবর পেয়ে দেশে এসে ছোট ভাইয়ের কাছে গেলেন, দেখা করলেন। কথা বলে দেখলেন, ও এখন অনেক বড়ো জ্ঞানী। বড়ো বড়ো কিতাব তার একদম মুখস্থ, নিজেও লিখছে নানা কিতাব। রাজা তখন লজ্জা-শরম উপেক্ষা করে রাণীকে নিয়ে ছুটে গেলেন ছোট বাবুর কাছে।
গিয়ে বললেন, বাবা, আমার ভুল হয়েছে আমাকে ক্ষমা করে দাও।
ছোট বাবু বলল, বাবা, আপনি তো ভালো কাজ করেছেন। যথাযথ বিচার করেছেন। যোগ্য রাজার পরিচয় দিয়েছেন। আর জেলের ভিতরে থেকে আমি হয়ে গেলাম জ্ঞান পিপাসু।
রাজা বলল, এখন তুই কি চাস আমার কাছে?
ছোট বাবু বলল, কোন কিছুর বিশেষ প্রয়োজন নেই। সম্ভব হলে আমাকে গুটি কয়েক বই কিনে দিও।
রাজা বলল, আমি চাই তুই রাজা হবি।
ছোট বাবু বলল, আমার রাজা হওয়ার যোগ্যতা নেই। আমি জ্ঞানী হবো……..। তোমরা বাড়ি ফিরে যাও।
তারপর থেকে ছোট বাবুর প্রধান কাজ হলো জ্ঞান অর্জন করা। তিনি হলেন মস্ত বড়ো জ্ঞানী, চার দিকে শুধু তার খ্যাতি।
কি বুঝলে, দাদা ভাই? এখন কি বল, তুমি কি জ্ঞান অর্জন করবে না? জ্ঞানী হবে না?
মাহিম বলল, জি, দাদা। আমি আজ থেকে পড়তে বসবো। ছোট বাবুর মতো আমিও হবো মস্ত বড়ো জ্ঞানী।
লেখকঃ শাহ বিলিয়া জুলফিকার