যৌন হয়রানি বন্ধে চাই সামাজিক প্রতিরোধ

banglanewsus.com
প্রকাশিত August 3, 2022
যৌন হয়রানি বন্ধে চাই সামাজিক প্রতিরোধ

মো. আতিকুর রহমান ::: যৌন হয়রানি দেশে একটি মারাত্মক সামাজিক ব্যাধি হিসেবে দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে গ্রামে-গঞ্জে, শহরে-নগরে সবখানে মেয়েরা যৌন হয়রানির শিকার হচ্ছে। পত্রিকার পাতা খুললেই প্রতিদিন দেশের কোথাও না কোথাও এমন নির্মম ঘটনার শিকার হওয়া স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় অথবা কর্মস্থলে আসা মেয়েদের খবর চোখে পড়ছে, যা দুঃখজনক। সাম্প্রতিক সময়ে যৌন হয়রানি মেয়েদের জন্য একপ্রকার অভিশাপে রূপ নিয়েছে। অসভ্য ও বখাটে শ্রেণির যুবক, শিক্ষার্থী ও নরপশুরা প্রতিনিয়ত বিভিন্নভাবে মেয়েদের ওপর এহেন যৌন হয়রানি করেই চলেছে। যা মেনে নেয়া কঠিন।
গত ১৭ জুলাই চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে এক ছাত্রী এমনি যৌন হয়রানির নির্মম ঘটনার শিকার হয়। যদিও ওই ঘটনাটি বিশেষভাবে সবার সামনে আসে গত ২০ জুলাই রাতে। সেই রাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা এ ঘটনার প্রতিবাদে উপাচার্যের বাসভবনের সামনে অবস্থান নিলে সে খবর গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়। মেয়ের ভাষ্য অনুযায়ী, ‘ওই সময় পাঁচ-ছয়জন অজ্ঞাতনামা তাদের ধরে হয়রানি করে, মারধর করে এবং মোবাইল ছিনতাই করে বিশ্ববিদ্যালয়ের বোটানিক্যাল গার্ডেন সংলগ্ন এলাকা থেকে। ছিনতাই করার পর তাদের বোটানিক্যাল গার্ডেনের পেছনের দিকের রাস্তা যেটি প্রায় অন্ধকার থাকে, সেখানে নিয়ে গিয়ে কাপড় খুলে মোবাইলে ভিডিও ধারণ করে। সে সময় তাকে যৌন হয়রানিও করা হয় বলে জানায় ওই ছাত্রী। এরপর তাকে হুঁশিয়ারি দেয়া হয় যে, সে যদি এ ঘটনা অন্য কোথাও বলে তাহলে সেই ভিডিও প্রকাশ করে দেয়া হবে। যা সত্যি বেদনাদায়ক। যদিও এমন অনেক ঘটনা প্রতিনিয়তই হচ্ছে কিন্তু অনেকে ভয়ে, লজ্জায় তা প্রকাশ করছে না। যদিও ইতোমধ্যে র‌্যাবের বিশেষ অভিযানে অপরাধী একই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র নামক ৬ জন নরপশুর মধ্যে ৪ জনকে ধরা সম্ভব হয়েছে। যা ইতিবাচক বলে মনে করি। এখন ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বাকিদের অতিদ্রুত ধরে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা হবে- এমনটি সবার প্রত্যাশা।
বিভিন্ন কারণে যৌন হয়রানির মতো অশ্লীল কাজ ঘটে থাকে। যেমন নারীর প্রতি সম্মান প্রদর্শন না করা, নারীকে মূল্যায়ন না করা, বেকারত্ব, অশিক্ষা ও অর্ধশিক্ষা, পরিবার থেকে নৈতিক শিক্ষার অভাব, পারিবারিক ও রাজনীতিক আশ্রয়-প্রশ্রয়, কঠোর আইন ও তার সুষ্ঠু প্রয়োগের অভাব, সামাজিক সচেতনতার অভাব ও মূল্যবোধের অবক্ষয়, অপসংস্কৃতির বিস্তার, পর্নো ছবির প্রচার, মাদকে অবাধ আসক্ত হওয়া প্রভৃতি সমাজে যৌন হয়রানির মাত্রাকে বাড়িয়ে দিচ্ছে। এক্ষেত্রে উল্লেখিত বিষয়গুলো দ্রুত প্রতিকারে সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টা জরুরি বলে মনে করি।
এ ধরনের ঘটনা বেশিরভাগ ঘটে থাকে স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় ও নিজ নিজ কর্মস্থলে। যৌন হয়রানির ফলে নারীরা যেমন বিপর্যস্ত হয় তেমনি অনেকে আত্মহত্যাও করে, অনেকে অকালে পড়ালেখা বন্ধ করে ঘরে বসে থাকে। আবার বাধ্য হয়ে অনেক পরিবার অল্প বয়সে মেয়েদের বিয়ে দেয়, অনেক নারী চাকরি ছাড়তে বাধ্য হয়, বখাটেদের বাধা দিতে গিয়ে অনেকে জীবন হারায়। যৌন হয়রানি প্রতিরোধে আমরা নিম্নোক্ত পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারি : ১. যৌন হয়রানি প্রতিরোধে নারী, পরিবার ও জনগণকে সচেতন থাকতে হবে। ২. এ ধরনের অসামাজিক কাজের বিরুদ্ধে কঠোর আইন প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করা অপরিহার্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। আইন প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করলে বখাটেরা ভয় পেয়ে যৌন হয়রানি করা থেকে বিরত থাকবে। ৩. নারীদের উত্ত্যক্তকারী বখাটেদের চিহ্নিত করে খুব দ্রুত পুলিশের হাতে তুলে দিতে হবে এবং আইনি কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব সহকারে তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদান করতে হবে। এতে একজনের শাস্তি দেখে যেন অন্যরা যৌন হয়রানি করা থেকে বিরত থাকবে। ৪. যৌন হয়রানি রোধে মেয়েরা যদি নিজেদের সাহসিকতার পরিচয় দিতে পারে এবং ঐক্যবদ্ধ হয়ে চলে তাহলে বখাটে ছেলেরা যৌন হয়রানি থেকে বিরত থাকবে। ৫. যৌন হয়রানি বন্ধে বাংলাদেশ সরকার নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের বিচারিক ক্ষমতা দিয়ে ভ্রাম্যমাণ আদালতে তাৎক্ষণিকভাবে বখাটেদের বিচারের মুখোমুখি করা। দোষীদের জেল, জরিমানা ও কারাদণ্ড প্রদান করা। তাছাড়া মেয়েদের নিরাপদ ও নির্বিঘেœ চলাচলের জন্য বাংলাদেশ পুলিশ সদর দপ্তরের পক্ষ থেকে দৃশ্যমান উদ্যোগ গ্রহণ করা অধিক জরুরি বলে মনে করি।
পরিশেষে বলতে চাই যেহেতু যৌন হয়রানি অন্যতম সামাজিক সমস্যা। আমাদের দেশের ছাত্রী এবং নারী সমাজকে যৌন হয়রানি নামক নির্মম অভিশাপ থেকে দ্রুত মুক্তি দেয়া অপরিহার্য হয়ে পড়েছে। আর নারীকে এই অভিশাপ থেকে মুক্তি দিতে হলে সমাজ থেকে এসব ভণ্ড, লম্পট ও মাতাল বখাটে এবং ভালোর মুখোশধারীদের নির্মূল করতে হবে। এ লক্ষ্য বাস্তবায়নের জন্য কঠোর আইন প্রণয়ন এবং বাস্তবায়ন করতে হবে। পাশাপাশি বখাটেদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। এই কাজটি বাস্তবায়ন করতে সংশ্লিষ্টদের সম্মিলিত উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।

মো. আতিকুর রহমান : সাবেক জনসংযোগ কর্মকর্তা, বিইউএফটি, ঢাকা।

এই সংবাদটি 1,228 বার পড়া হয়েছে

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন।